
অনলাইন নিউজঃ সরকার ঘোষিত সাপ্তাহিক ছুটি শুক্রবার হলেও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে চট্টগ্রাম রফতানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকার (ইপিজেড) বেশ কিছু কারখানা সাপ্তাহিক ছুটি পরিবর্তন করে বৃহস্পতিবার করেছে। ক্রেতাদের নির্ধারিত সময়ে রফতানি পণ্য সরবরাহ করতে গেল দুই সপ্তাহ ধরে শুক্রবার কারখানা খোলা রেখে উৎপাদন চালাচ্ছেন এসব প্রতিষ্ঠানের মালিকরা।
বিদ্যুৎ সংকটের কারণে অনেক কারখানায় প্রতিদিন কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। উৎপাদন ঘাটতি পুষিয়ে নিতে ওভারটাইমও করানো যাচ্ছে না। এতে উৎপাদন খরচ বাড়ার পাশাপাশি সময়মতো পণ্য জাহাজীকরণ নিয়েও তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। নির্ধারিত সময়ে পণ্য উৎপাদন ও জাহাজীকরণ সম্ভব না হলে উড়োজাহাজে পণ্য পাঠানোর মতো ব্যয়বহুল বিকল্প বেছে নিতে হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।
গ্যাসনির্ভর ডাইং কারখানাগুলোও সরবরাহ সংকটের কারণে উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছে। ফলে চট্টগ্রাম ইপিজেডের সামগ্রিক উৎপাদন ও রফতানি কার্যক্রমে এর প্রভাব পড়ছে।
চট্টগ্রাম ইপিজেডে প্রায় দুই লাখ মানুষের কর্মসংস্থান রয়েছে। এখানে মোট ৫০১টি শিল্প প্লট রয়েছে। বাংলাদেশ ছাড়াও চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, নেদারল্যান্ডস, মালয়েশিয়া ও ভারতের বিনিয়োগকারীরা এসব প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করেছেন। ইপিজেড থেকে বছরে প্রায় ২৩৭ কোটি ৫৭ লাখ মার্কিন ডলারের পণ্য রফতানি হয়।
ইপিজেড কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, সেখানে নিজস্ব ক্যাপটিভ পাওয়ার প্ল্যান্টের মাধ্যমে প্রায় ৭০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। এ জন্য প্রয়োজন ১৫ থেকে ১৭ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। কিন্তু বর্তমানে গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় মাত্র ৭ মেগাওয়াটের মতো বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে।
ইপিজেডে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে বেসরকারি ইউনাইটেড গ্রুপের ক্যাপটিভ পাওয়ার প্ল্যান্ট রয়েছে। তবে গ্যাস সংকটের কারণে প্ল্যান্টটি পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারছে না।
সংকট সামাল দিতে ইপিজেড কর্তৃপক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সরকারি বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) বর্তমানে ৩৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে। তবে প্রয়োজনীয় বিদ্যুতের বাকি অংশ না পাওয়ায় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো উৎপাদন সচল রাখতে হিমশিম খাচ্ছে।
আমেরিকা-কোরিয়াভিত্তিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান হেমপেল রি ম্যানুফ্যাকচারিং লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ শাহেদুল ইসলাম বলেন, গেল দুসপ্তাহ আমরা বৃহস্পতিবার ছুটি দিয়ে, শুক্রবার কারখানা খোলা রেখেছি। শুক্রবার অনেকগুলো কারখানা বন্ধ থাকে। তাই বিদ্যুৎ সরবরাহ ভালো পাব আশায় খোলা রাখছি। এ ছাড়া বিকল্প দেখছি না।
চট্টগ্রাম ইপিজেড বন্ড কমার্শিয়াল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক বিশ্বজিত সরকার বলেন, মাত্র বিদ্যুৎ না থাকায় প্রতিদিন দুই ঘণ্টা করে সপ্তাহে ১২ ঘণ্টা অর্থাৎ দেড়দিন কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। এই কর্মঘণ্টা আমাদের উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ক্রেতার টার্গেট অনুযায়ী পণ্য উৎপাদন করা যাচ্ছে না।
তিনি বলেন, সময়মতো পণ্য জাহাজে পাঠানো সম্ভব না হলে এয়ারশিপমেন্ট করতে হবে। এতে রফতানিকারকদের মুনাফা কমে যাবে।
লোডশেডিং সামাল দিতে নিজস্ব জেনারেটরের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগও নিয়েছেন কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। তবে জেনারেটর স্থাপনে বেপজার অনুমতি পেতে দীর্ঘসূত্রিতার অভিযোগ রয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা বলেন, মাসে সাড়ে তিন লাখ টাকা খরচে নতুন জেনারেটর বসাতে অনুমতি পেতেও সপ্তাহের বেশি সময় লাগছে। এভাবে চললে বিনিয়োগকারীরা বিরক্ত হয়ে উঠছেন।
জ্বালানি সংকটের সমাধানে বৃহস্পতিবার বেপজা ভবনে মালিক ও বিনিয়োগকারীদের নিয়ে বৈঠক করেছে চট্টগ্রাম ইপিজেড কর্তৃপক্ষ। বৈঠকে রফতানি কার্যক্রম নির্বিঘ্ন রাখতে দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক করার দাবি জানানো হয়।
চট্টগ্রাম ইপিজেডের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ শরিফুল ইসলাম বলেন, ইপিজেডে উৎপাদন ব্যাহত হওয়া ভাবমূর্তির বিষয়ও। অগ্রাধিকার বিবেচনায় সেখানে দ্রুত বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে মন্ত্রণালয় অনুমোদন দিয়েছে। পিডিবির সদিচ্ছাই এখন জরুরি হয়ে পড়েছে।
তবে পিডিবি দক্ষিণ জোনের প্রধান কামাল উদ্দিন বলেন, বিষয়টি সদিচ্ছার নয়, আইনি। ইউনাইটেড পাওয়ারের সাথে বিদ্যুৎ সরবরাহের চুক্তি নেই। এরপরও সেখান থেকে বিদ্যুৎ নিয়ে সরবরাহ করলে আইনি জটিলতা তৈরি হবে।
তিনি বলেন, সংকটের সময়ে চট্টগ্রাম ইপিজেডে ৬০ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ দিতে পিডিবি প্রস্তুত। তবে ইপিজেডের ওই বিদ্যুৎ নেওয়ার সক্ষমতা নেই।
এর জবাবে ইপিজেডের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ শরিফুল ইসলাম বলেন, বিদ্যমান লাইনে ৩৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ দেওয়া সম্ভব। বাকি ৩৫ মেগাওয়াট নিতে নতুন ট্রান্সফর্মার প্রয়োজন। সেটি স্থাপন না হওয়া পর্যন্ত ইউনাইটেড পাওয়ারের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এর বিল ইপিজেড কর্তৃপক্ষ পরিশোধ করবে এবং প্রয়োজনে বেপজা এ বিষয়ে দায়িত্ব নেবে।
তবে সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, গ্যাস সরবরাহ না বাড়ানো পর্যন্ত সংকটের স্থায়ী সমাধান কঠিন। গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হলে ইউনাইটেড পাওয়ারের ক্যাপটিভ প্ল্যান্ট পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারবে। তখনই চট্টগ্রাম ইপিজেডের শিল্পকারখানাগুলোও পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদনে ফিরতে পারবে।
মন্তব্য করুন