
অনলাইন ডেস্ক: দেশজুড়ে গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের তেমন উন্নতি হয়নি। কক্সবাজারের মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি (এফএসআরইউ) টার্মিনাল বন্ধ থাকার প্রভাব এখনও কাটেনি। জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ কম থাকায় চাহিদামতো বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাচ্ছে না। ফলে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘ সময় লোডশেডিং অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে আবাসিক এলাকায় গ্যাসের স্বল্পচাপ, শিল্পাঞ্চলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে ভোগান্তিও কমেনি।
এদিকে গতকাল মঙ্গলবার সচিবালয়ে সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেছেন, বর্তমানে লোডশেডিং এবং জ্বালানি সংকট সমাধানে সরকার সচেষ্ট। এ ব্যাপারে সরকার কাজ করছে। আশা করি, দ্রুতই সমাধান হবে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি বাংলাদেশের (পিজিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, গতকাল মঙ্গলবার বিকেল ৩টায় দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল প্রায় ১৫ হাজার ৯৫৯ মেগাওয়াট। ওই সময়ে লোডশেডিং হয়েছে দুই হাজার ২৮৮ মেগাওয়াট। তবে রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। গত সোমবার রাত ১২টায় ১৬ হাজার ৬৩৫ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে লোডশেডিং দাঁড়ায় তিন হাজার ২৩২ মেগাওয়াটে, যা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের এক প্রকৌশলী সমকালকে বলেন, কয়েক সপ্তাহ আগেও বিদ্যুৎ উৎপাদনে দৈনিক প্রায় ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যেত। বর্তমানে তা কমে প্রায় ৭০ কোটি ঘনফুটে নেমেছে। রোববার বিদ্যুৎ খাতে সরবরাহ করা হয়েছে মাত্র ৬৮ কোটি ঘনফুট গ্যাস। এতে কয়েক হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে গেছে।
জ্বালানি বিভাগ সূত্র জানায়, মহেশখালীর এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে গত ২১ জুলাই অগ্নিকাণ্ড ও কারিগরি ত্রুটির পর একটি টার্মিনাল বন্ধ রয়েছে। ফলে জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন প্রায় ৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাস কম সরবরাহ হচ্ছে। বর্তমানে দেশে মোট গ্যাস সরবরাহ নেমে এসেছে প্রায় ২১৫ কোটি ঘনফুটে, যা দৈনিক চাহিদার চেয়ে অনেক কম।
পেট্রোবাংলার একটি সূত্র জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনালটির বয়লার মেরামত শেষ হয়েছে, তবে এখনও পরীক্ষামূলক চালানো হয়নি। আজকালের মধ্যে এটি পরীক্ষা করা হতে পারে। এই সংকটে সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে শিল্পাঞ্চলে। গাজীপুর, সাভার, নারায়ণগঞ্জ ও ফতুল্লার গ্যাসনির্ভর কারখানাগুলোতে প্রয়োজনীয় ১৫ পিএসআই চাপের বদলে মিলছে ২ থেকে ৩ পিএসআই। ফলে টেক্সটাইল, তৈরি পোশাক, স্পিনিং ও সিরামিক শিল্পে উৎপাদন সক্ষমতা অর্ধেকের নিচে নেমে এসেছে। অনেক কারখানা দিনের বদলে রাতে উৎপাদন চালানোর চেষ্টা করছে। নির্ধারিত সময়ে রপ্তানি পণ্য পাঠাতে না পেরে অতিরিক্ত ব্যয়ে উড়োজাহাজে পণ্য পাঠাতে হচ্ছে। শিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএ ও বিটিএমএ দ্রুত গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করার দাবি জানিয়েছে।
পরিবহন খাতেও সংকটের প্রভাব স্পষ্ট। রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে এখনও দীর্ঘ সারি দেখা যাচ্ছে। অনেক চালক রাতভর অপেক্ষা করেও ২০০ থেকে ৩০০ টাকার গ্যাস সংগ্রহ করতে পারছেন। এতে সড়কে সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও বাসের সংখ্যা কমে গেছে। যাত্রীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। অনেক এলাকায় বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগও রয়েছে।
আবাসিক গ্রাহকদের দুর্ভোগও কমেনি। দিনের বড় একটি সময় চুলায় গ্যাস না থাকায় অনেক পরিবার হোটেলের খাবারের ওপর নির্ভর করছে। কেউ কেউ বৈদ্যুতিক চুলা ব্যবহার শুরু করলেও লোডশেডিংয়ের কারণে সেটিও নিয়মিত ব্যবহার করা যাচ্ছে না। ফলে গ্যাস ও বিদ্যুতের যুগপৎ সংকট সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
চট্টগ্রামেও বাড়ছে লোডশেডিংয়ের দুর্ভোগ
চট্টগ্রাম ব্যুরো জানিয়েছে, বন্দরনগরী চট্টগ্রামেও বিদ্যুতের ঘাটতি বেড়েছে। নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ঘণ্টায় ঘণ্টায় বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। বাসাবাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, অফিস, আদালত–সবখানেই এর প্রভাব পড়ছে।
নগরীর আরকান হাউজিং সোসাইটির বাসিন্দা জেসমিন আক্তার বলেন, বিদ্যুৎ একবার গেলে এক থেকে দুই ঘণ্টার আগে আসে না। প্রচণ্ড গরমে ঘরে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে।
পিডিবির কর্মকর্তারা জানান, জাতীয় গ্রিড থেকেই চাহিদার চেয়ে কম বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। সোমবার সন্ধ্যায় চট্টগ্রামে চাহিদা ছিল প্রায় এক হাজার ২৫০ মেগাওয়াট। কিন্তু সরবরাহ পাওয়া গেছে ৯৫০ মেগাওয়াট। প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট ঘাটতি থাকায় বাধ্য হয়ে লোডশেডিং করতে হচ্ছে। পরিস্থিতি কবে স্বাভাবিক হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট করে কিছু বলতে পারেননি কর্মকর্তারা।
মন্তব্য করুন