
অনলাইন নিউজঃ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আগামী পাঁচ বছরে টোকিওর ৬শ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতিকে স্বাগত জানিয়েছেন। শিল্প ও বন্দর সহযোগিতা সম্প্রসারণের জন্য জাপানের এই উদ্যোগ বাংলাদেশকে আঞ্চলিক বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বারে পরিণত করতে পারে। এর মাধ্যমে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং বৃহত্তর ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বাজারগুলোর সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের পাশাপাশি ঢাকার অর্থনৈতিক সম্পর্কের বৈচিত্র্য বাড়বে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
এই বিনিয়োগ এমন এক সময়ে এল, যখন বাংলাদেশ জ্বালানি সংকট মোকাবিলা করছে এবং তৈরি পোশাক রপ্তানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কমানোর চেষ্টা করছে। গত সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারি জাপান সফরকালে এ পরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়। মঙ্গলবার টোকিওতে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, “আমাদের লক্ষ্য স্পষ্ট: দুই দেশের মধ্যকার এই বন্ধুত্বকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সুযোগ এবং অভিন্ন সমৃদ্ধির এক শক্তিশালী চালিকাশক্তিতে পরিণত করা।”
এক যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, অর্থনৈতিক স্বায়ত্তশাসন সুরক্ষা এবং ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি মোকাবিলায় দুই দেশ ২০১৪ সালে গৃহীত বঙ্গোপসাগর শিল্প প্রবৃদ্ধি বলয় উদ্যোগকে (বিগ-বি) আরও বিস্তৃত করে ‘অভিন্ন সমৃদ্ধির জন্য বিগ-বি’ কাঠামোতে উন্নীত করবে। বাংলাদেশের মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে নেওয়া এ উদ্যোগের লক্ষ্য বড় বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের উপযোগী অবকাঠামো তৈরি, রপ্তানি পরিবহনব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং ত্রিপুরার মধ্য দিয়ে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যসহ প্রতিবেশী স্থলবেষ্টিত বাজারগুলোর জন্য সমুদ্রপথে প্রবেশাধিকার সৃষ্টি করা।
দু’দেশের মধ্যে সামুদ্রিক সহযোগিতাও সম্প্রসারিত হয়েছে। জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সোমবার জানায়, বঙ্গোপসাগরে সামুদ্রিক নজরদারি, অনুসন্ধান ও উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বাংলাদেশ কোস্টগার্ডকে টহল জাহাজ সরবরাহে ১ কোটি ৩৪ লাখ ডলার অনুদানের বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে উেভয় পক্ষের মধ্যে নথিপত্র বিনিময় হয়েছে। এর আগে, ২০২৩ সালে টোকিও-ঢাকা সম্পর্ক ‘কৌশলগত অংশীদারত্বে’ উন্নীত হয়। এর ধারাবাহিকতায় গত ফেব্রুয়ারিতে একটি অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যার মাধ্যমে শুল্ক বাধা কমানো হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, এই বিনিয়োগ উদ্যোগটি নতুন সরকারের সেই আকাক্সক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যেখানে তারা চীন ও ভারতের ওপর প্রথাগত অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতার বাইরে গিয়ে বৃহত্তর কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন অর্জনের চেষ্টা করছে। ভারতের ও.পি. জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক অধ্যাপক শ্রীরাধা দত্ত মনে করেন, ঢাকার এই কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের প্রচেষ্টাকে নয়াদিল্লি হুমকি হিসেবে দেখবে না। তিনি বলেন, “ভারত বিশ্বাস করে যে, জাপান এই অঞ্চলে এমন কিছু করবে না যা ভারতের স্বার্থের পরিপন্থী। তারেক রহমানের এই জাপান সফর সম্ভবত ভারতের চেয়ে চীনের জন্যই একটি বড় বার্তা।”
তবে দিল্লিভিত্তিক ‘গ্লোবাল ট্রেড রিসার্চ ইনিশিয়েটিভ’-এর প্রতিষ্ঠাতা অজয় শ্রীবাস্তব মনে করেন, এই সম্প্রসারণের ফলে চীনের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা কম। তিনি বলেন, “জাপানের বিনিয়োগ বাংলাদেশের কোনো একটি নির্দিষ্ট অংশীদারের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে পারে এবং দরকষাকষির সক্ষমতা জোরদার করতে পারে। তবে যন্ত্রপাতি ও পণ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে চীন যেমন একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে রয়েছে, অন্যদিকে ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে আঞ্চলিক বাণিজ্য ও পরিবহনের ক্ষেত্রে ভারতও একটি কেন্দ্রীয় অবস্থানে রয়েছে।”
এদিকে, লন্ডনভিত্তিক ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক প্রিয়াজিত দেবসরকার বলেছেন যে, ভারতের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে সংকীর্ণ শিলিগুড়ি করিডোর বা ‘চিকেন্স নেক’-এর মাধ্যমে যুক্ত ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে প্রবেশাধিকার নিয়ে গত এক বছরে বাংলাদেশের যে উত্তপ্ত বাগবিতণ্ডা হয়েছে, তা দিল্লিতে তীব্র প্রতিক্রিয়া ও নিরাপত্তা বিষয়ক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। দুই বছরেরও বেশি সময় আগে ব্যাপক ছাত্র আন্দোলনের মুখে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনার পর থেকে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা আরও বেড়েছে। দিল্লির দৃষ্টিকোণ থেকে, দিল্লির দৃষ্টিতে, জনাব রহমানের জাপান সফরের একটি সম্ভাব্য সুফল হলো, টোকিও ঢাকাকে আঞ্চলিক উন্নয়নের সহায়ক ঘনিষ্ঠ আন্তসীমান্ত সম্পর্ক বজায় রাখতে উৎসাহিত করতে পারে।
বাংলাদেশ যখন মহামারিপূর্ব প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধারে সংগ্রাম করছে, তখন মধ্যপ্রাচ্যে সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় জ্বালানি সংকট ও শিল্প খাতের দুরবস্থা আরও প্রকট হয়েছে। এরমধ্যে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন প্রবৃদ্ধির হার ৩.২ শতাংশ হবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে, যা এপ্রিলে করা ৪.৩ শতাংশের পূর্বাভাস থেকে কম। লন্ডনভিত্তিক ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক প্রিয়াজিত দেবসরকার বলেন, “ঢাকার জন্য সর্বোত্তম কৌশল হবে বাণিজ্যিক যুক্তিগুলো স্পষ্টভাবে তুলে ধরা- যেমন উন্নত বন্দর, আরও বেশি কারখানা এবং বৃহত্তর বাজারে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা। এটি বিনিয়োগ আকর্ষণে সহায়তা করবে, পাশাপাশি নিজস্ব কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগও বজায় রাখবে।”
সূত্র: সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট।
মন্তব্য করুন