
অনলাইন নিউজঃ বাবা প্রদীপ জলদাসকে হারিয়েছিলেন ১১ বছর আগে। এরপর গার্মেন্টসে কাজ করে দুই ছেলেকে বড় করেছেন মা আশোকী জলদাস। বড় ছেলে চন্দনও চাকরি করেন, আর ছোট ছেলে সানি জলদাস মাত্র ২০ বছর বয়সে কাজ শুরু করেছিলেন জাহাজভাঙা ইয়ার্ডে। পরিবারের স্বপ্ন ছিল, একদিন সানি তাদের কষ্টের দিন বদলাবেন। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না। জাহাজভাঙা ইয়ার্ডে বিষাক্ত গ্যাসে প্রাণ গেল সানির।
শুক্রবার সকাল ৯টার দিকে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারী ইউনিয়নের সমুদ্র উপকূলে অবস্থিত ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজ নামের একটি জাহাজভাঙা কারখানায় বিষাক্ত গ্যাসে বিষক্রিয়ায় নয় শ্রমিক নিহত হন। তাঁদের একজন সানি জলদাস।
সানির বাড়ি সীতাকুণ্ড উপজেলার ভাটিয়ারী মির্জানগর জেলেপাড়ায়। প্রায় দুই বছর ধরে তিনি ওই জাহাজভাঙা ইয়ার্ডে কাজ করতেন।
শনিবার সকালে সানির নানা সুবল দাসের সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, তাঁদের পরিবারের কোনো স্থায়ী বসতভিটা নেই। একসময় সাগরে মাছ ধরে জীবিকা চলত। তাঁর তিন ছেলে ও দুই মেয়ের মধ্যে সানির বাবা প্রদীপ জলদাস ছিলেন সবার বড়।
বিয়ের কয়েক বছর পর অসুস্থ হয়ে পড়েন প্রদীপ। দূরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হলেও অর্থের অভাবে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা করাতে পারেননি। একপর্যায়ে ১১ বছর আগে মারা যান তিনি। তখন তাঁর দুই ছেলে—চন্দন ও সানি ছিল ছোট।
স্বামীকে হারানোর পর মা আশোকী জলদাস গার্মেন্টসে চাকরি নেন। সেই আয়ে দুই ছেলেকে বড় করেন। বড় ছেলে চন্দনও এখন গার্মেন্টসে কাজ করেন। সংসারের হাল ধরতে ছোট ছেলে সানি যোগ দেন জাহাজভাঙা ইয়ার্ডে।
নানা সুবল দাস বলেন, ‘২০ বছরের নাতি এভাবে অকালে চলে যাবে, কখনো ভাবিনি। ওদের সংসারে এমনিতেই অনেক কষ্ট। বাবা নেই, মা অনেক কষ্ট করে দুই ছেলেকে বড় করেছে।’
সানির বড় ভাই চন্দন জানান, সীতাকুণ্ড মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মামলা সংক্রান্ত বিষয়ে তাঁদের থানায় ডেকেছেন। তবে পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা করতে তাঁরা রাজি নন বলে জানান তিনি।
সানির এক স্বজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযোগ করেন, দুর্ঘটনার পর সানি ইয়ার্ডের গেটের সামনে চলে এসেছিলেন। কিন্তু তাঁকে দ্রুত বের হতে দেওয়া হয়নি বলে দাবি করেন তিনি। পরে তাঁরা জানতে পারেন, বিষাক্ত গ্যাসে শ্রমিকরা অসুস্থ হয়ে পড়েছেন।
ওই স্বজনের অভিযোগ, দুর্ঘটনার পর দ্রুত অক্সিজেন ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যবস্থা করা গেলে হয়তো প্রাণহানি কমানো সম্ভব হতো। ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষের গাফিলতির কারণেই এতগুলো তরতাজা প্রাণ ঝরে গেছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
মাত্র ২০ বছর বয়সেই সানির জীবন থেমে গেল। যে মা স্বামীকে হারিয়ে বছরের পর বছর গার্মেন্টসে কাজ করে ছেলেদের বড় করেছেন, সেই মায়ের কাঁধেই এখন সন্তানের লাশের শোক। পরিবারের দুঃখ-কষ্ট দূর করার স্বপ্ন দেখা সানি নিজেই এখন পরিবারের জন্য রেখে গেলেন গভীর শূন্যতা।
মন্তব্য করুন