
প্রতি বছর সারাবিশ্বে যত মানুষ অন্ধ হয়ে যান, তার একটা বড় অংশ ঘটে জ্বর ঠোসার ভাইরাস এর কারণে। এ ছাড়াও জ্বর ঠোসা থেকে যৌনাঙ্গের হার্পিস হতে পারে, যা একবার হলে পুরোপুরি নির্মূল করার উপায় এখনো আবিষ্কৃত হয়নি। নবজাতকের মাঝে ভাইরাসটি ছড়ালে তার মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। তাই জ্বর ঠোসা হলে হেলাফেলা না করে কিছু সতর্কতা অবলম্বন করা খুব গুরুত্বপূর্ণ। জ্বর ঠোসা নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন চিকিৎসক তাসনিম জারা। যা নিম্নে তুলে ধরা হলো-
জ্বর ঠোসা কেন হয়?
জ্বর ঠোসা একটি ছোঁয়াচে রোগ। এটি ‘হার্পিস সিমপ্লেক্স’ নামের একটি ভাইরাসের কারণে হয়। এই ভাইরাস শরীরে বিভিন্নভাবে প্রবেশ করতে পারে। যেমন—
১. জ্বর ঠোসায় আক্রান্ত ব্যক্তির মুখ কিংবা মুখের লালার সংস্পর্শে আসলে জ্বর ঠোসা ছড়াতে পারে।
২. জ্বর ঠোসা স্পর্শ করে সেই হাত অন্য কারও মুখের সংস্পর্শে নিলে জ্বর ঠোসা ছড়াতে পারে।
৩. জ্বর ঠোসায় আক্রান্ত ব্যক্তির মুখ কারও যৌনাঙ্গের সংস্পর্শে আসলে যৌনাঙ্গে ইনফেকশন ছড়িয়ে পড়তে পারে।
৪. শরীরে একবার জ্বর ঠোসার ভাইরাস প্রবেশ করলে সেটি সারাজীবন থেকে যায়। বেশিরভাগ সময়ে ভাইরাস শরীরে নিষ্ক্রিয় অবস্থায় থাকে, তবে মাঝেমাঝে জেগে উঠে জ্বর ঠোসা তৈরি করে। একারণে অনেকের বারবার জ্বর ঠোসা হয়।
ভাইরাস জেগে ওঠার অন্যতম কারণ হলো শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়া। যেমন: ঠাণ্ডা লাগা অথবা জ্বর আসা। তবে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়া ছাড়াও আরও কিছু কারণে ভাইরাস জেগে উঠে জ্বর ঠোসা তৈরি হতে পারে।
মলম: জ্বর ঠোসার ব্যথা কমাতে লিডোকেইন জাতীয় জেল অথবা মলম ব্যবহার করতে পারেন।
ঔষধ: ব্যথা, জ্বর ও ফোলা কমাতে প্যারাসিটামল অথবা আইবুপ্রোফেন খেতে পারেন। শিশুদের প্যারাসিটামল সিরাপ খাওয়াতে পারেন।
৪. পানিশূন্যতা এড়ানো: জ্বর ঠোসা হলে ব্যথার কারণে অনেকেই খাবার ও পানি খাওয়া কমিয়ে দেয়। একারণে পানিশূন্যতা দেখা দেয়। তাই পর্যাপ্ত পানি পান করছেন কিনা সেদিকে খেয়াল রাখবেন।
৫. ত্বক ফাটা এড়াতে পেট্রোলিয়াম জেলি: ত্বক শুষ্ক হয়ে ফেটে যাওয়া এড়াতে জ্বর ঠোসার ওপরে ও এর আশেপাশের ত্বকে আলতো করে পেট্রোলিয়াম জেলি লাগাবেন। এর আগে ও পরে অবশ্যই সাবান-পানি দিয়ে ভালোমতো হাত ধুয়ে ফেলবেন।
৬. রোদ থেকে সুরক্ষা: রোদে বের হলে সানস্ক্রিন, বিশেষ করে ঠোঁটে সানব্লক লিপ বাম (এসপিএফ ১৫ বা তার বেশি শক্তির) ব্যবহার করবেন।
৭. বারবার জ্বর ঠোসা হওয়া ঠেকানো: যেসব কাজ জ্বর ঠোসার ভাইরাসকে জাগিয়ে দিতে পারে সেগুলো এড়িয়ে চলবেন। যেমন: রোদ, মানসিক চাপ ও অতিরিক্ত ক্লান্তি। এতে পরবর্তীতে জ্বর ঠোসা হওয়ার সম্ভাবনা কমতে পারে।
যা করবেন না
১. জ্বর ঠোসা হাত দিয়ে স্পর্শ করবেন না। কোনো কারণে স্পর্শ করতে হলে (যেমন: ঔষধ লাগানোর সময়ে) তার আগে ও পরে অবশ্যই সাবান ও পানি দিয়ে ভালোমতো হাত ধুয়ে ফেলবেন।
২. আক্রান্ত অবস্থায় কাউকে চুমু দিবেন না। বিশেষ করে ছোটো শিশুদের চুমু দেওয়া থেকে একেবারেই বিরত থাকবেন।
৩. জ্বর ঠোসা থাকা অবস্থায় আপনার খাবার অথবা পানি আরেকজনের সঙ্গে শেয়ার করবেন না।
৪. জ্বর ঠোসায় ছোঁয়া লাগে এমন জিনিসপত্র—যেমন: আপনার ব্যবহার করা চামচ, গ্লাস, তোয়ালে, রেজার, লিপজেল ও লিপস্টিক—এগুলো আলাদা রাখবেন। অন্য কেউ যেন ব্যবহার না করে সেই বিষয়ে সতর্ক থাকবেন।
৫. জ্বর ঠোসা থাকলেও সহবাস করা যাবে। তবে জ্বর ঠোসা পুরোপুরি সেরে ওঠার আগ পর্যন্ত ওরাল সেক্স বা যৌনাঙ্গে মুখ স্পর্শ করা থেকে একেবারে বিরত থাকবেন। নাহলে আপনার সঙ্গীর যৌনাঙ্গে হার্পিস ইনফেকশন ছড়িয়ে পড়তে পারে।
৬. জ্বর ঠোসা থাকা অবস্থায় চোখে হাত লাগাবেন না। কোনো কারণে চোখে হাত দিতে হলে আগে ভালো করে হাত সাবান-পানি দিয়ে ধুয়ে নিবেন।
৭. কারও কারও ক্ষেত্রে কিছু খাবার জ্বর ঠোসার সংস্পর্শে আসলে জ্বালাপোড়া সৃষ্টি করতে পারে। যেমন: টমেটো, কমলা, মাল্টা, জাম্বুরা, অতিরিক্ত মসলাদার ও লবণযুক্ত খাবার। আপনার এমন সমস্যা হলে এসব খাবার এড়িয়ে চলতে পারেন।
৮. জরুরি প্রয়োজন না হলে জ্বর ঠোসা পুরোপুরি সেরে ওঠার আগ পর্যন্ত দাঁতের কোনো প্রসিডিউর না করানোই ভালো।
মন্তব্য করুন